মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০২২, ০৪:২০ পূর্বাহ্ন

“গভীর সঙ্কটে পড়তে যাচ্ছে পোশাক শিল্প”

রিপু / ১৯২ বার
আপডেট : বুধবার, ২৪ আগস্ট, ২০২২

নিজস্ব প্রতিবেদক, নরসিংদী খবর ||

এক ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই হাজির হয়ে যাচ্ছে আরেক ধাক্কা। একের পর এক ধাক্কায় চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দেশের প্রধান রফতানি আয়ের খাত তৈরি পোশাক শিল্প। বৈশ্বিক সঙ্কটের কারণে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো পোশাক ক্রয়ের নতুন আদেশ দেওয়া কমিয়ে দিচ্ছেন আশঙ্কাজনক হারে। বিগত কয়েক মাসে গড়ে ৩০-৩৫ শতাংশ রফতানি আদেশ কমে গেছে।>

এর মধ্যে এককভাবে দেশের পোশাকের সবচেয়ে বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট ঘোষণা দিয়েছে ৩০ শতাংশ অর্ডার কমিয়ে দেবে বিশ্ববাজারে। এতে চরম আতঙ্কে পড়েছেন পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। তারা মনে করেন, আবারও গভীর সঙ্কটে পড়তে যাচ্ছে পোশাক শিল্প।>
এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, গত দুই ধাপে প্রায় ৭৫ শতাংশ (গত ৫ জুন ৫০ শতাংশ, তার আগে ২৫ শতাংশ) জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় এমনিতেই সঙ্কট দেখা দিয়েছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধিসহ নানা কারণে এমনিতেই উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে পোশাক শিল্পে। এর বিপরীতে পোশাকের দাম তো বাড়ায়ইনি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো- উল্টো এখন অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে। এ কারণে পোশাক শিল্প করোনা মহামারির সময়কার মতো আবারও গভীর সঙ্কটে পড়তে যাচ্ছে।>

এ বিষয়ে বিকেএমইএ সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান সময়ের আলোকে বলেন, বৈশ্বিক সঙ্কটের কারণে শুধু ওয়ালমার্ট নয়, বিশ্বের অনেক দেশের নামি-দামি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানও এখন অর্ডার বাতিল করছে। আমি যে বায়ারের কাজ করি তারাও গত বছরের চেয়ে ৩৫ শতাংশ অর্ডার কমিয়েছে। এভাবে এখন গড়ে ৩০-৩৫ শতাংশ অর্ডার কম আসছে গার্মেন্টস শিল্পে। যা দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাকের ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আমরা করোনা মহামারির সঙ্কটকালীন সময়ে সরকারের প্রণোদনা থেকে ঋণ নিয়ে শ্রমিকদের বেতন দিয়েছি। সে ঋণের টাকা এখন শোধ করতে হচ্ছে। ফলে এই অবস্থার মধ্যে যদি কারখানাগুলো কাজের অভাবে বন্ধ থাকে তাহলে একদিকে যেমন ঋণের টাকা শোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে, অন্যদিকে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেওয়াও কঠিন হবে।>

তিনি আরও বলেন, আমি আশা করব ওয়ালমার্ট আগে থেকে যেসব অর্ডার দিয়ে রেখেছে সেগুলো বাতিল করবে না, সেটি করা সমীচীনও হবে না। তবে বৈশ্বিক সঙ্কটের কারণে হয়তো তারা নতুন অর্ডার কমাতে পারে। যদি সেটি তারা করে তাহলে তার প্রভাব বাংলাদেশে তো অবশ্যই পড়বে। বিশেষ করে আমাদের দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা বছরজুড়ে শুধু ওয়ালমার্টেরই কাজ করে থাকে। যদি ওয়ালমার্ট অর্ডার কমিয়ে দেয় তাহলে এসব কারখানা মহা সঙ্কটে পড়বে। কারণ হুট করেই তো নতুন আরেকটি বায়ারের কাজ জোগাড় করা যাবে না। এ কারণে ওয়ালমার্টের অর্ডার কমে গেলে এসব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের মজুরি দেওয়াও সমস্যা হবে।>

যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট চলতি মাসে সারা বিশ্বের উৎপাদকদের দেওয়া শত শত কোটি ডলার মূল্যের পণ্য কেনার আদেশ বাতিল করেছে। মূল্যস্ফীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোক্তারা কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন। এতে লক্ষ্য অনুযায়ী নিয়মিত পণ্য বিক্রি করতে পারছে না দেশটির খুচরা বিক্রেতারা। ভোক্তা চাহিদা কমার সঙ্গে সমন্বয় করতে তাই উৎপাদকদের কাছ থেকে কম পরিমাণে পণ্য কিনছে এসব কোম্পানি।>
ওয়ালমার্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে গত অর্থবছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের (এপ্রিল-জুন) তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তাদের ইনভেনটরি পর্যায়ের ক্রয়াদেশ ২৬ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় বাড়েনি বিক্রির চাহিদা। এতে তারা বিপাকে পড়েছে। এ কারণে ৩০ শতাংশ ক্রয়াদেশ কমাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। একই ধরনের সঙ্কটে পড়েছে ওয়ালমার্টের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি টার্গেট করপোরেশন। তাদের অবস্থা ওয়ালমার্টের চেয়েও খারাপ।>

অন্যদিকে ওয়ালমার্টের এই পদক্ষেপে ইতোমধ্যে দুশ্চিন্তায় পড়েছে বিভিন্ন দেশের সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো। বাংলাদেশের পোশাক পণ্যের বড় ক্রেতাদের একটি হলো ওয়ালমার্ট। তাই প্রতিষ্ঠানটি এ দেশেও কিছু ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত করেছে বলে জানা গেছে। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখ পড়বেন সংশ্লিষ্ট পোশাক ব্যবসায়ীরা।>

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে পোশাক বিক্রি কমেছে। বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো জানাচ্ছে, পোশাক কেনার খরচ কমিয়ে ফেলছেন ক্রেতারা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে পোশাকের কেনাবেচায় দীর্ঘমেয়াদি ভাটা পড়বে। এ পরিস্থিতি ঠিক কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, তাও বলতে পারছেন না কেউই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে দীর্ঘসময় লাগতে পারে।>>

ওয়ালমার্টের নির্বাহীরা জানিয়েছেন, ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতারা পোশাক কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। এতে অনেক অর্ডার বাতিল করতে হচ্ছে। ওয়ালমার্ট তাদের বেশিরভাগ সামার কালেকশন (গ্রীষ্মকালীন সংগ্রহ) বিক্রি করে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের ইনভেনটরি নতুন করে ঠিক করছে। চলমান পরিস্থিতি ঠিক হতে দুই প্রান্তিক (ছয় মাস) লেগে যেতে পারে।

বিজিএমইএ নেতারা বলেন, ওয়ালমার্টের অর্ডার বাতিলের তথ্য বিভিন্ন কারখানার মালিক বিজিএমইএকে জানাচ্ছেন। বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকেও সদস্য কারখানার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। যাদের অর্ডার বাতিল হচ্ছে, সেগুলোর তথ্য রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ায় পোশাক উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে অন্তত ২০ শতাংশ। বাড়তি খরচ সামাল দেওয়ার উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না পোশাক কারখানার মালিকরা।

কারখানার মালিকরা বলছেন, বর্তমানে উৎপাদন পর্যায়ে রয়েছে- এমন পোশাকের দাম অন্তত দুই মাস আগে নির্ধারণ করা হয়েছে। তখনকার পরিস্থিতি অনুযায়ী চুক্তি হয়েছে। অথচ তার মধ্যেই হঠাৎ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় খরচ বেড়ে গেছে। উৎপাদন পর্যায়ে এসে নতুন করে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের সুযোগ নেই। ফলে লোকসান গুনেই পোশাক উৎপাদন করতে হচ্ছে তাদের।

অন্যদিকে দেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরকারি তথ্য সরবরাহকারী সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বলছে, জুলাই শেষে জোটে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। এটা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আর পোশাকের একক প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ দশমিক ১ শতাংশ। এটা গত ৪১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। মূলত রেকর্ড মূল্যস্ফীতির কারণে এসব দেশে পোশাকের চাহিদা কমছে।

বাংলাদেশের নিট পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম খাত হচ্ছে রফতানি। অথচ পোশাকসহ অন্যান্য পণ্যে বায়ার থেকে নতুন অর্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, এমনকি চলমান অর্ডারও স্থগিত রাখা হচ্ছে। আমরা কঠিন সময় পার করছি। তিনি আরও বলেন, আমরা নানাভাবে জুলুমের শিকার হচ্ছি। এনবিআরের পলিসি ব্যবসাবান্ধব নয়। ব্যাংকগুলোও নানাভাবে জুলুম করছে। আন্তর্জাতিকসহ নানাভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। গ্যাস সঙ্কটে উৎপাদন কমছে। এ কারণে রফতানির পরিবর্তে আমদানি বাড়ছে। এতে সরকারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিজিএমইএ’র পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল সময়ের আলোকে বলেন, বৈশ্বিক মন্দার প্রভাব ইউরোপ-আমেরিকা অঞ্চলের অনেক দেশেই পড়েছে। এজন্য আগে থেকেই আমরা শঙ্কা করছিলাম পোশাক রফতানির ওপর আবার আঘাত আসতে পারে। এ জন্য বিগত কয়েকদিন ধরেই আমরা বলে আসছি- সামনে খারাপ সময় আসতে পারে। সে আশঙ্কাই বাস্তব হলো বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ চেইন শপ ওয়ালমার্টের ঘোষণার মধ্য দিয়ে। যেহেতু আমরা আগে থেকেই বিষয়টি নিয়ে সতর্ক ছিলাম বা প্রস্তুত ছিলাম, সেজন্য বিষয়টি আমাদের কাছে নতুন কিছু না। তবে শিল্পের জন্য এটা বড় ধাক্কা। কেননা এমনিতেই জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিসহ নানা কারণে আমাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে।

এর মধ্যে যদি আবার ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অর্ডার কমে যায় তাহলে পুরো পোশাক শিল্পের জন্য ক্ষতির বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে ওয়ালমার্ট হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। ওয়ালমার্টের অর্ডার বাতিল হওয়া মানে এক-দুই লাখ ডলার বাতিল হওয়া না, তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অর্ডার বাতিল করতে পারে। সে ক্ষেত্রে ওয়ালমার্টের অর্ডার কমে যাওয়ার চাপ পোশাক শিল্প সামলাতে পারবে না। কারণ অনেক কারখানা আছে যারা শুধু ওয়ালমার্টেরই কাজ করে, ওয়ালমার্টের জন্য পোশাক তৈরি করে। এসব প্রতিষ্ঠানগুলো সঙ্কটে পড়ে যাবে। সুতরাং এই ধাক্কা সামলে ওঠা খুবই কঠিন হবে। এই পরিস্থিতি আমাদের জন্য খুবই খারাপ এবং এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই।

এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ   রিপু /নরসিংদী খবর

Facebook Comments Box


এ জাতীয় আরো সংবাদ